সনাতন ধর্ম
সনাতন ধর্ম কি?? সনাতন কি শুধু হিন্দুদের ধর্ম?? হিন্দুধর্ম কি কোন ধর্মের নাম??
হিন্দু শব্দটা মানুষের দেওয়া নাম। প্রাচীন সিন্ধু নদের অববাহিকায় যারা বসবাস করতেন তাদেরকে গ্রীক, পার্সিয়ান ইত্যাদি অঞ্চলের লোকেরা 'স' এর পরিবর্তে 'হ ' অর্থাৎ সিন্ধুর স্থলে হিন্দু বলে সম্বোধন করতেন। সিন্ধু নদের তীরবর্তী স্থানকে সিন্ধুস্থান এর স্থলে হিন্দুস্থান বলে ডাকতেন। ঠিক এভাবেই ইন্ডিয়া, হিন্দুস্থান, হিন্দু শব্দগুলো এসেছে। সুতরাং, হিন্দু কোন ধর্ম নয়। আমাদের ধর্মের নাম হলো সনাতন। বেদ, গীতা, উপনিষদে কোথাও হিন্দু শব্দের উল্লেখ নেই। এখন প্রশ্ন হলো এত ধর্মের ভীড়ে কোন ধর্ম সত্য সেটা কিভাবে বুঝবো?? পৃথিবীতে প্রায় ৪২০০ টা ধর্ম রয়েছে। কোন ধর্ম সত্য?? খ্রিস্টানেরা বলবে খ্রিস্টধর্ম সত্য, মুসলিমেরা বলবে ইসলাম ধর্ম সত্য, আমরাও দাবী করবো আমাদের ধর্ম সত্য। কিন্তু, সত্য যে কোনটা সেটা কিভাবে বুঝবো?? প্রথমত আমরা সবাই জানি যে সৃষ্টিকর্তা মূলত একজন, তাহলে সৃষ্টিকর্তা যদি একজন হয় সৃষ্টিকর্তা প্রণীত ধর্মও একটা হবে।
এখন সেই ধর্ম কোনটা সেটা নির্ণয়ের জন্য সৃষ্টির আদি থেকে যে ধর্ম ছিলো সেই ধর্মই হবে জীবের প্রকৃত ধর্ম। কারণ, হঠাৎ করে কিছু বছর আগে কয়েকজন ব্যক্তি এসে দাবী করলো সৃষ্টিকর্তা হলেন ইনি, সৃষ্টিকর্তা হলেন উনি। ঈশ্বর সাত আসমানের উপরে থাকে, চল্লিশ আসমানের উপরে থাকে। আগে যা ধর্ম ছিলো সব বাতিল, এখন নতুন ধর্ম হলো এইটা। এইগুলো হলো একটা নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রচারিত মতবাদ, এগুলো ধর্ম হতে পারে না। ধর্ম হলো সেটা যা ঈশ্বর কর্তৃক প্রণীত, আর ঈশ্বরের প্রণীত ধর্ম একের অধিক হতে পারে না এবং তা সৃষ্টির শুরু থেকেই বিদ্যমান থাকে। সনাতন ধর্ম হলো সেই ধর্ম যা সৃষ্টির শুরু থেকে বিদ্যমান। কোন মানুষ এসে এই ধর্ম প্রচার করেন নি। স্বয়ং ঈশ্বরই এই ধর্ম প্রণয়ন করেছেন। কাজেই, সনাতন হলো প্রতিটা জীবের ধর্ম। এখন বিশ্বে বিভিন্ন মতবাদ ধর্ম নামে প্রচলিত আছে। এই মতবাদসমূহের উদ্ভব এই কলিযুগেই এবং কলিযুগেই এইগুলো ধ্বংস হবে৷ শাস্ত্রে লেখা ও আছে, কলিযুগে বিভিন্ন আসুরিক ব্যক্তিরা দেবতাদের কাছ থেকে শক্তি পেয়ে নিজের মনগড়া মতবাদকে ধর্ম নামে চালাবে, অধিকাংশ মানুষ এই আসুরিক মতবাদসমূহের প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং কলিযুগে অধর্মকেই ধর্ম নামে অভিহিত করা হবে। আমরা এখন সেটাই দেখছি।
অন্যান্য মতবাদে তাদের নির্দিষ্ট সম্প্রদায় ব্যতীত অন্য সম্প্রদায়ের মানুষকে ঘৃণার চোখে দেখা হয়৷ কিন্তু, সনাতন ধর্মে নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বলে কিছু নেই, আমরা প্রত্যেকেই সনাতন ধর্মের অন্তর্ভুক্ত সে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান যাই হোক না কেন। গীতার (১৫/৭) নং শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, মমৈবাংশো জীবলোক জীবভূতে সনাতন --------, আমিই হলাম সমস্ত জীবের সনাতন বিভিন্নাংশ। এখানে বলা হচ্ছে না যে হিন্দুরা শুধুমাত্র ঈশ্বরের অংশ। বরং সমস্ত জীবই ঈশ্বরের সনাতন বিভিন্নাংশ। আবার (১৫/১৫) শ্লোকে বলছেন, সর্বস্য চাহং হ্রদি সন্নিবিষ্ট --------, আমিই সমস্ত জীবের হ্রদয়ে অবস্থান করি। এখানে বলা হচ্ছে না যে, ঈশ্বর শুধুমাত্র হিন্দুদের হ্রদয়ে অবস্থান করেন। তিনি প্রতিটি জীবের হ্রদয়েই অবস্থান করেন, সে হোক মানুষ, উদ্ভিদ, পশুপাখি আদি ৮৪ লক্ষ প্রজাতি সবকিছুর মধ্যেই ঈশ্বর পরমাত্মা রুপে অবস্থান করছেন। আমাদের প্রকৃত পরিচয় হলো আমরা জীবাত্মা, যা পরমাত্মার অংশ। পুরুষ, নারী, পশুপাখি, জীবজন্তু এগুলো আমাদের বাহ্যিক পরিচয়। আমরা একটা পোশাক পরিধান করে আছি, মৃত্যুর সময় আত্মা সেই পোশাক বা দেহ ত্যাগ করে অন্য পোশাক পরিধান করে। ৮৪ লক্ষ প্রজাতির কোন না কোন পোশাক পরিধান করে আমরা জন্ম - মৃত্যুর চক্রে আবর্তন করছি। তাই যখন পশুর শরীর প্রাপ্ত হই তখন নিজেকে পশু মনে করি, যখন পুরুষের শরীর প্রাপ্ত হই তখন নিজেকে পুরুষ মনে করি, যখন নারীর শরীর প্রাপ্ত হয় তখন নিজেকে নারী মনে করি৷ কিন্তু, আমাদের প্রকৃত পরিচয় আমরা এইসব কেউ না, আমরা হলাম চিন্ময় আত্মা যা পরমাত্মার অংশ। অংশের কাজ হলো পূর্ণের সেবা করা, তাই জীবাত্মার একটাই লক্ষ্য তা হলো পরমাত্মার সান্নিধ্য লাভ করা৷ শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে বলা হয়েছে জীবাত্মা না পুরুষ, না নারী, না নপুংসক, জীবাত্মা হলো এক চিন্ময় সত্ত্বা। গীতাতেও বলা হয়েছে, আত্মাকে অস্ত্রের দ্বারা ছেদন করা যায় না, অগ্নিতে দাহ করা যায় না, জলে সিক্ত করা যায় না। আত্মা শুধু তার শরীর পরিবর্তন করে।
তাই জীবাত্মা যখন মুসলিম ঘরে জন্মগ্রহণ করে তখন সে নিজেকে মুসলিম ভাবে, হিন্দু ঘরে জন্মগ্রহণ করলে নিজেকে হিন্দু ভাবে, বৌদ্ধ ঘরে জন্মগ্রহণ করলে নিজেকে বৌদ্ধ ভাবে, আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করলে নিজেকে আমেরিকান ভাবে, ভারতে জন্মগ্রহণ করলে নিজেকে ভারতীয় ভাবে। কিন্তু, জীবাত্মা আসলে হিন্দু, মুসলিম, আমেরিকান, রাশিয়ান, ভারতীয় কেউ নন। জীবাত্মা মানুষ, পশু, পাখি, উদ্ভিদ কিছুই নয়। জীবাত্মার প্রকৃত পরিচয় তা পরমাত্মার অংশ, আর পরমাত্মার সান্নিধ্য লাভ না করা পর্যন্ত সে বিভিন্ন শরীর প্রাপ্ত হবে। যখন পরমাত্মাকে প্রাপ্ত করবে তখন জীবাত্মা জন্ম- মৃত্যুর চক্র থেকে চিরতরে মুক্ত পাবে ্আর এটাই হলো সনাতন। যার অর্থ দাড়ালো এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের কেউই সনাতন ধর্মের বাইরে নয়, জীব মাত্রই সনাতন। কিন্তু, সে দেহগত পার্থক্যের জন্য বহিরঙ্গা মায়ার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সে নিজের প্রকৃত পরিচয় ভুলে গিয়ে মিথ্যা পরিচয়ে পরিচিত হচ্ছে। তাই সনাতন ধর্ম কখনো ত্যাগ করা যায় না এবং সনাতন ধর্ম কখনো গ্রহণ ও করা যায় না। কারণ, সৃষ্টির প্রতিটা সৃষ্ট জীবই হলো সনাতন, সেই জীব জন্মের পূর্বেও সনাতন ছিলো, এখনো আছে, মৃত্যুর পরে ও সে সনাতন থাকবে। কারণ, আত্মার কখনো মৃত্যু হয় না। চিনি থেকে যেমন তার মিষ্টতা পৃথক করা যায় না, জল থেকে যেমন তার তরলতা পৃথক করা যায় না, তেমনি জীবাত্মা থেকে
পরমাত্মাকে কখনো পৃথক করা যায় না। সুতরাং, আমাদের মধ্যে কোন বিভেদ নেই, আমরা সবাই সনাতন।
সনাতনের জয় হোক, বিশ্ব মানবতার জয় হোক।
ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তি
Comments
Post a Comment